দুর্যোগে দুর্গত মানুষের বন্ধু রেডিও

Publish Time : 9 November, 2019 9:09 : PM

সারাবিশ্বে বেতার এখনও অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম। এখনো মানুষ রেডিও শোনে। এখনো রেডিওর ওপর নির্ভর করে অনেক মানুষ। অনেকেরই ধারণা ইন্টারনেটের অগ্রযাত্রার এই সময়ে রেডিও তার গুরুত্ব হারিয়েছে। ধারণাটি সঠিক নয় মোটেই।

কারণ সময় যেমন বদলেছে, ঠিক তেমনই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রচারণার ধরণও বদলে গেছে। অন্যদিকে, স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার এই যুগে রেডিও নিয়ে আলোচনাটা অনেকের কাছে বাহুল্য মনে হতে পারে।

বাস্তবতা হলো, রেডিও এখনো যে কত শক্তিশালী মাধ্যম এবং প্রান্তিক মানুষের বিপদে-আপদে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে, তাদের অভাব-অভিযোগ কিংবা উন্নয়ন আর হাসি-কান্নায় কতটা কাছে থাকে, সেটি মাঠপর্যায়ে না দেখে কারো পক্ষে আন্দাজ করা কঠিন।

বিশেষ করে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালু থাকা কমিউনিটি বেতার বেসরকারি এফএম আর বাংলাদেশ বেতারের কেন্দ্রগুলো নানা ইস্যুতে মানুষকে তথ্যসহায়তা দিয়ে যেভাবে ক্ষমতায়িত করছে, সেটি নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমে আরো বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

Rohingya language - রোহিঙ্গা ভাষার অনুষ্ঠান

রেডিওর গুরুত্ব আছে বলেই বাংলাদেশে ২৮টি প্রাইভেট এফএম এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও এফএম চলছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ বেতার ১২টি আঞ্চলিক বেতারকেন্দ্র এবং ৩৫টি এফএম পরিচালনা করছে সরকার।

বর্তমানে দেশের নানা স্থানে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতার প্রতিদিন ২৭৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট অনুষ্ঠান প্রচার করছে।

আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ঠাকুরগাঁও, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দারবান ও কুমিল্লা। এছাড়া অনুষ্ঠান প্রচারে ইউনিটগুলো হচ্ছে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস, বহির্বিশ্ব কার্যক্রম, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেল এবং ট্রাফিক সম্প্রচার কার্যক্রম।

১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হয় জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব বেতার দিবস। তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিওগুলো অংশ নিচ্ছে।

রেডিও উপস্থাপনা

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের বেতার দিবসের থিম ছিল ‘দুর্যোগ’। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় স্বভাবতই এখানে বেতারের দায়িত্ব অনেক বেশি।

দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চালু থাকা কমিউনিটি রেডিওগুলোও এরই মধ্যে সেই দায়িত্ব পালনে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় সময় যখন উপকূলের অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন স্থানীয় পর্যায়ের এই রেডিও গুলো প্রতি মুহূর্তের খবর জানিয়েছে কমিউনিটির মানুষকে।

রেডিওতে আবহাওয়ার সংবাদ শুনে বহু জেলে সমুদ্র থেকে ফিরে এসে নিজের জীবন বাঁচিয়েছেন, এ রকম উদাহরণও রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়েও এখন প্রান্তের মানুষ যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। কেননা রেডিও প্রতিনিয়তই এই বিষয়ের ওপর প্রতিবেদন, সচেতনতামূলক বার্তা ও অনুষ্ঠান প্রচার করছে।

দরিদ্র মানুষের ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব প্রতিরোধ বা প্রশমনের লক্ষ্যে বেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে নিয়মিতই সচেতন করছে। তা ছাড়া প্রতিনিয়তই প্রচার করছে আবহাওয়ার খবর।

বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে যেখানে সামাজিক দুর্যোগসহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিধস প্রভৃতি ঋতুভিত্তিক ও নৈমিত্তিক দুর্যোগ রয়েছে; রেডিও এসব ক্ষেত্রে আগেই বিপজ্জনক আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্ক সংকেত স্থানীয় ভাষায় সহজভাবে প্রচার করছে।

দুর্যোগ-পূর্ব, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অবহিত করছে রেডিও। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজনের কলাকৌশল প্রচারেও রেডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অ্যামেচার রেডিও

রেডিও কারিগরি ভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। ফলে দুর্যোগের সময়েও রেডিও চালু থাকে। এমনকি বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলেও অবিরাম সম্প্রচার চালিয়ে যেতে সক্ষম। তা ছাড়া জরুরি অবস্থায় রেডিওর ভূমিকা ও অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কেননা সঠিক তথ্যের অভাবে নাগরিকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

রেডিও সে ক্ষেত্রে গুজবের বিপরীতে বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক তথ্য দিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে থাকে বন্ধুর মতো।

বলা হয়, তথ্যই শক্তি। তথ্যহীনতা মানুষকে বিপদাপন্ন করে। আর তথ্য জানা থাকলে মানুষ সম্ভাব্য বিপদ বা দুর্বিপাক মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারে। রেডিও মানুষকে সেই ভরসাটি দিচ্ছে বা দিতে পারছে।

মনে রাখা দরকার, রেডিওর মূলত যারা শ্রোতা, তাদের বেশির ভাগই সমাজের সুবিধাভোগী অংশের বাইরে। যারা জেলে, কৃষক, দিনমজুর, স্বল্প আয়ের মানুষ-তারাই মূলত রেডিওর শ্রোতা ও কর্মী।

অন্যদিকে, রেডিও এখন শাখা-প্রশাখায় অনেক বিস্তৃত। মূলত চারটি ধারায় রেডিও সম্প্রচার করে থাকে, যথা: পাবলিক সার্ভিস, আন্তর্জাতিক রেডিও, বাণিজ্যিক রেডিও এবং কমিউনিটি রেডিও।

পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ বেতার যেমন অনুষ্ঠান ও খবর সম্প্রচার করছে; তেমনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, ভয়েস অব আমেরিকা, এন এইচ কে, রেডিও তেহরান, রেডিও চায়না ও অন্যান্য বিদেশি মাধ্যমেও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারছি।

আবার দেশে সাম্প্রতিক কালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সম্প্রচার করছে শহরভিত্তিক বেসরকারি এফএম রেডিও। সব মিলিয়ে রেডিওর প্রচার দিনে দিনে প্রসারিত হচ্ছে।

লেখক: মসরুর জুনাইদ, সভাপতি – ডিএক্সার ফোরাম অব বাংলাদেশ ( ডিএফবি) ও সিইও – Dxingworld.com