অ্যামেচার রেডিও এর অপূর্ব জগৎ : বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের অনন্য মাধ্যম

অ্যামেচার রেডিও পরিচালনা করা মূলত একটি শখ। শখের বিষয় হলেও জ্ঞানর্জনের সুযোগ আছে। এটি একটি বিজ্ঞানমনস্ক শখ বিধায় ইলেকট্রোনিক্সসহ বেতার তরঙ্গ নিয়ে প্রচুর অধ্যায়নের সুযোগ মেলে।

অ্যামেচার রেডিও (আরেক নাম হ্যাম রেডিও) এর ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ দেশে দেশে নির্ভর করে।

তবে কয়েকটা ব্যান্ড বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন, বিশেষত HF এর ক্ষেত্রে।

অন্য ব্যান্ডগুলো জাতীয় ভাবে বা অঞ্চল ভেদে আলাদা আলাদা রেন্জে ব্যব হৃত হয় বিশেষ করে VHF এবং UHF তরঙ্গ।

১৯০৮ সালের দিকে কয়েকজন রেডিও অপারেটর যখন সফলভাবে কোনো তার ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সংকেত পাঠাতে সক্ষম হলেন, সেই সময় তাঁরা নিজেদের হ্যাম বলে ঘোষণা দিলেন।

তাঁরা নিজেদের কেন্দ্রে বসে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন।

একটি ক্লাব বানিয়ে নাম দিলেন হার্ভার্ড রেডিও ক্লাব। সম্ভবত এটাই বিশ্বে প্রথম রেডিও ক্লাব।

এ ক্লাবের সদস্য ছিলেন তিনজন—আলবার্ট এস হাইমেন, বব আলমই ও পুগি মারি।

প্রথমে তাঁরা ক্লাবটির নাম দিলেন হাইমেন-আলমই-মারি। ১৯১১ সালে আমেরিকা কংগ্রেস তাঁদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে ক্লাবটির নাম রাখে হ্যাম।

সেই থেকে সব অ্যামেচার রেডিও ব্যবহারকারী ‘হ্যাম’ নামে পরিচিত।

অ্যামেচার রেডিও বা হ্যাম রেডিও কি? 

দুর্যোগে যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়, যোগাযোগব্যবস্থা বলতে আর কিছুই থাকে না, ঠিক তখনই এগিয়ে আসেন হ্যাম।

অ্যামেচার রেডিও বা শৌখিন বেতার যোগাযোগব্যবস্থায় একজন ব্যবহারকারী নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ বেতার গ্রাহক ও প্রেরকযন্ত্রের অধিকারী।

এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বেতারতরঙ্গ ব্যবহার করে নিজের শহর, দেশ, এমনকি পৃথিবীর যেকোনো দেশের ওই ধরনের বেতারযন্ত্র ব্যবহারকারীর সঙ্গে তথ্য বিনিময় করা যায়।

এর বড় সুবিধা হলো এতে কোনো মাশুল গুনতে হয় না।

মোদ্দা কথা, অ্যামেচার রেডিও হলো একটি শখ। একটি বেতারযন্ত্র দিয়ে অন্য একটি বেতারযন্ত্রে কথা বলা বা তথ্য নেওয়া-দেওয়াই হলো অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের কাজ।

এই অপারেটররা পাহাড়ের চূড়া, নিজের বাসা অথবা গাড়িতে বসে চাইলে মহাকাশযানের নভোচারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।

নভোচারীদের সবাই হ্যাম। মহাকাশে যাওয়ার সময় তাঁরা সবাই কল-সাইন ব্যবহার করে অন্য হ্যামদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

মূলত বেতারযন্ত্রের সাহায্যে অ্যামেচার রেডিও সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে বন্ধুত্বের হাতছানি।

উপরি হিসেবে বিপদ-আপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কাজ তো আছেই।

ভয়ংকর দুর্যোগে বিপন্ন মানবতার সাহায্যে অ্যামেচার রেডিও বা হ্যাম রেডিও

শীতের কুয়াশা জড়ানো সকাল। রাতের জড়তা কাটিয়ে সবে জেগে উঠছে শহরটি।

আচমকা প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনিতে নড়ে উঠল সবকিছু। ধসে পড়ল ভারতের গুজরাটের ভুজ শহর।

চোখের পলকে চার লাখ ঘরবাড়ি হুড়মুড়িয়ে পড়ল মাটিতে। প্রাণ হারাল ২০ হাজার মানুষ।

আহত হলো এক লাখ ৬৭ হাজার। যোগাযোগব্যবস্থা বলতে আর কিছুই রইল না। ঘটনাটি ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারির।

এ ভয়ংকর দুর্যোগে বিপন্ন মানবতার সাহায্যে এগিয়ে এলেন কিছু মানুষ। তাঁদের হাতে ১০০ ওয়াটের একটি ট্রান্সমিটার।

গাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী ১২ ভোল্টের একটি ব্যাটারি আর কিছু তার। ঘটনাস্থলেই পাওয়া গেল লম্বা একটি বাঁশ। সেটি ব্যবহার করা হলো টাওয়ার হিসেবে।

মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে চালু হয়ে গেল বেতারকেন্দ্র। এ কেন্দ্রের সঙ্গে একে একে যুক্ত হলেন ১৫০ ব্যক্তি। হাতে একটি করে ওয়াকিটকি।

তাঁরা ছড়িয়ে পড়লেন শহরের সর্বত্র। এরপর পৃথিবী জানল ভুজের মর্মান্তিক দুর্যোগের সংবাদ।

সেদিন যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন শৌখিন রেডিও অপারেটর। দুনিয়াজুড়ে তাঁরা পরিচিত ‘হ্যাম’ নামে।

শুধু ভারতের কথা কেন, আমাদের দেশে ১৯৯১ সালের সেই ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের সময়ও রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকারীদের সঙ্গে কক্সবাজারে ছিলেন একদল হ্যাম।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কক্সবাজারের পুরো যোগাযোগব্যবস্থা সেদিন অকেজো হয়ে পড়েছিল। এগিয়ে এসেছিলেন একজন জাপানি শৌখিন রেডিও অপারেটর। তাঁর বেতার থেকে সেই খবর ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে।

অ্যামেচার রেডিও অপারেটর কেন হবেন

অ্যামেচার রেডিও অপারেটদের নিজস্ব স্বতন্ত্র কল সাইন রয়েছে। এই কল সাইন থাকাটা সম্মানেরও বৈকি! এদের মুক্তভাবে রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বৈধভাবে গবেষণার সুযোগ আছে।

দেশ ও বিদেশের অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের সুবিশাল হ্যাম নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে যেকোনো দুর্যোগের সময় এসব অপারেটররা একে অন্যকে সহযোগিতা করেন।

বিদেশে হ্যামগণ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সাহায্য করে থাকেন। নোয়া ওয়েদার স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদী দেশব্যাপী প্রচার করেন।

বিদেশে হ্যামদের নিয়ে নিয়মিত ডিএক্সিং হয়, হ্যামফেস্ট ও হ্যামভেনশন হয়। এছাড়াও হ্যামরা ফিল্ড ডে ও ফক্স হান্টিং করেন।

এদেশেও এই চর্চাটা শুরু হয়েছে। দেশের হ্যামরা দুর্যোগের সময় নিজেদের প্রস্তুত রাখতে নিয়মিত মহড়া দেন। স্কাউটদের জোটাতে সহযোগিতা করেন। এতে করে হ্যামদের মধ্যে কিউএসএল কার্ড আদান-প্রদান হয়।

আপনি জানলে অবাক হবেন, মহাকাশচারীরা সবাই হ্যাম। তাই পৃথিবী থেকে হ্যাম রেডিওর মাধ্যমে মহাকাশচারীরে সঙ্গে রেডিও দিয়ে বিনাখরচে কথা বলার সুযোগ রয়েছে।

হ্যামরা চাঁদের পিঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসা রেডিও ওয়েভ নিয়ে গবেষণা করে থাকেন।

কেউ কেউ অ্যামেচার ফ্রিকোয়েন্সি মনিটর করে সরকারকে সহায়তা করেন। এ ছাড়াও যেকোনো দুর্যোগে কুইক রেসপন্স টিমের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন।

অভিজ্ঞ হ্যামগণ নিজ হাতে হোমব্রিউ শক্তিশালী অ্যান্টেনা, ট্রান্সমিটার ও রিসিভার বানান।

হ্যামদের জন্যই কেবল আলাদা স্যাটেলাইট (অস্কার, অ্যামস্যাট) ও বিদেশে টেলিভিশন (স্লো/ফাস্ট স্ক্যান টিভি) স্টেশন আছে। যা হ্যাম চর্চায় সহায়ক।

হ্যামগণ শুধু তাদের গবেষণার জন্যই কিউবস্যাটের মতো ছোট ছোট মাইক্রো স্যাটেলাইট মহাশূন্যে ভাসিয়ে থাকেন।

বিদেশে এ বিষয়ে আগ্রহী লোকজন আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ট বন্ধুবান্ধবসহ সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়ে গ্রুপসহ অ্যামেচার রেডিও লাইসেন্স নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে থাকেন।

আর এই কথাবার্তা বলার জন্য মোবাইল ফোনের মতো কোন কলচার্জ নেই, সম্পূর্র্ণ বিনা পয়সায় আপনি সারা দিন কথা বলতে পারবেন।

মজার ব্যাপার হলো বিদেশি স্কুবা ডাইভার, নাবিক, প্লেনের পাইলট ও মহাশূন্যচারীগণও অ্যামেচার রেডিও অপারেটর হয়ে থাকেন।

বিদেশে চাকরি বিশেষ করে জাতিসংঘের চাকরিতে হ্যামরা বাড়তি সুবিধা পান।

হ্যামদের ব্যবহূত রেডিও সেটহ্যামদের ব্যবহূত রেডিও সেট

থাইল্যান্ডের রাজা ভূমিপাল, সৌদি যুবরাজ তালাল, স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোস, জর্ডানের বাদশা হুসেন, তাঁর স্ত্রী নুর, অভিনেতা মারলন ব্রান্ডো, ডলবি সাউন্ড সিস্টেমের উদ্ভাবক টনি ডলবির মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও হ্যাম।

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ছিলেন হ্যামদের কাছে খুব জনপ্রিয়।

তাঁর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধীও হ্যাম। সোনিয়া গান্ধী এখনো হ্যামদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।

রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পর তাঁর আততায়ীরা জঙ্গলে কোনো বেতারযন্ত্র ব্যবহার করছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য ভারতীয় পুলিশ সেই সময় হ্যামদের সহায়তা নিয়েছিল।

১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে হ্যাম রেডিও নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯২ সাল থেকে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে হ্যাম লাইসেন্সে প্রদান শুরু হয়।

আপনারা যারা আগ্রহী, তারা বিটিআরসি (www.btrc.gov.bd) থেকে পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য পেতে পারো।

দেশে ‘বাংলাদেশ অ্যামেচার রেডিও লিগ’ নামে হ্যাম রেডিওর একটি জাতীয় সংগঠন আছে। এর সদস্য প্রায় ২০০।

এ-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারো barl.org ওয়েবসাইট থেকে।

হ্যাম হতে চাইলে টেলিফোন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) ১০০ নম্বরের একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। সে পরীক্ষায় পাস করার পর নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স পাওয়া যায়।

লাইসেন্সের সঙ্গে পাওয়া যায় ‘কল-সাইন’। কল-সাইন হলো একজন অপারেটরের পরিচিতি। কল-সাইন দিয়েই প্রত্যেককে আলাদা করে চেনা যায়।

সব দেশের জন্য আছে আলাদা কল-সাইন।

সেটা শুনলেই বোঝা যাবে ব্যবহারকারীর পরিচয় এবং তিনি কোন দেশের বাসিন্দা। সারা পৃথিবীতে একজনের এককটি মাত্র কল-সাইন থাকবে।

তবে অ্যামেচার রেডিও কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যায় না। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আলোচনাও এতে নিষিদ্ধ।

Leave a Reply